ভালো আছি, ভালো থেকো (২)
|| দোলা সেন||
১৯/১১/২০২৪ (মঙ্গলবার)–
আজকের গন্তব্য রেড স্কিন আইল্যান্ড। ভাইয়ের পরিচিত কয়েকজন সঙ্গী হলেন। জলি বোট আর রেড স্কিন আইল্যান্ড পর্যায় ক্রমে খোলা থাকে। সম্ভবত কোরাল বাঁচাবার জন্য। জলি বয়ে কোরালের বৈচিত্র্য বেশি শুনলাম। রেড স্কিন সে তুলনায় কিছুটা নিষ্প্রভ। নৌকার মেঝে কাঁচের। তাই দিয়ে প্রবাল দেখা যায়। এই দ্বীপগুলোর সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হল, এখানে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে সময় কাটানো যায়। চায়ে গর্ম বা চাউমিন- ফুচকার দোকানের দেখা মেলে না। হালকা শুকনো খাবার এবং জল সঙ্গে রাখা ভালো। নৌাকার তলা স্বচ্ছ ফাইবারের। তা দিয়ে ফটিকস্বচ্ছ জলের তলে কোরাল দেখা যায়। প্রথম দর্শনের মুগ্ধতা বড় তীব্র হয়। জলের দিকে তাকিয়ে দেখি সেখানে নীল সবুজ ফিরোজা রঙের নানান স্তর। জলের এই বর্ণবৈচিত্র্য আন্দামানের সমুদ্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সেদিনই বিকেলে গেলাম সেুলার জেলে। ইতিহাস যেন জীবন্ত হয়ে ধরা দিল চোখের সামনে। গেট পার হতে পা কাঁপছিল। কেন্দ্রে একটি টাওয়ার। তার থেকে সাতটি উইং সাতদিকে ছড়িয়ে গেছে। সাতটির মধ্যে দুটি উইং দুটি আগেই ভেঙেছিল। দুটি উইং ভেঙে হাসপাতাল হয়েছে। এই নির্মাণের সময় বাকি দুটিও ধ্বংস হয়। এরপর একে হেরিটেজের মর্যাদা দেওয়ায়, সাত নম্বর উইংটি রক্ষা পায়। সেটিই এখন দর্শনার্থীদের জন্য খোলা। লম্বা টানা বারান্দা আর পরপর বন্দী কুঠরী। সাভারকার ছাড়া একমাত্র শচীন্দ্র নাথ সান্যালের নামে একটি কুঠরি উৎসর্গীকৃত।এক উইং থেকে অন্য উইংয়ে যেতে হলে সেন্ট্রাল টাওয়ার দিয়ে যেতে হয়। সে যোগাযোগও রাতে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হত। কয়েদী যেন কোনোভাবেই পালাতে না পারে। অবশ্য পালিয়ে যাবেই বা কোথায়? চারিদিকে অতলান্ত সমুদ্র আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু দ্বীপে আদিম হিংস্র জনজাতির বাস। উইংয়ে গা ঘেঁষেই ফাঁসির মঞ্চ। কাজ দ্রুত সারার জন্য তিনটি মঞ্চ পাশাপাশি! কয়েদীদের দিয়ে নারকেল ভাঙিয়ে শাঁস থেঁতো করে তেলের ঘানি ঘোরানো, রাস্তার জন্য পাথর ভাঙা – অমানুষিক পরিশ্রম – ঠিক করে দেওয়া মাপ অনুযায়ী কাজ না হলে বেতের ঘায়ে রক্তাক্ত করে দেওয়াটা তো জেলের প্রভুদের অতিরিক্ত বিনোদন। বলেছি বটে হিংস্র জনজাতি, কিন্তু পৈশাচিক হি়ংস্রতায় এই ইংরেজ এবং তাদের দেশীয় ভৃত্যেরা গুনে গুনে তাদের দশ গোল দিতে পারে। এই াত্যাচারের কর্মশালায় মডেলদের দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছিলাম। আঙ্কল টমস কেবিন কিংবা রুটস এর বর্ণনাও ফিকে লাগছিল। সন্ধ্যায় দেখব সেলুলার জেলের লাইট এন্ড সাউন্ড শো। সুন্দর উপস্থাপনা, কিন্তু তথ্যনিষ্ঠ লাগেনি। সকালেই দেখেছি পাথরে খোদাই বন্দীদের তালিকা। সেখানে নব্বই শতাংশই বাঙালী নাম। কিন্তু পুরো শো জুড়ে শুধুই সাভারকারের জয়জয়াকার। বাকি বিপ্লবী বন্দীদের বিশেষ উল্লেখ নেই। একটু তেতো মন নিয়েই বেরিয়ে এলাম। পাশেই একটা ছোট্ট পার্ক। সেখানে বেশ কিছু মূর্তি আছে। সেখানে উল্লাসকর দত্ত, শচীন্দ্রনাথ সান্যাল, হেমচন্দ্র প্রমুখ বেশ কয়েকজনের মূর্তি। শীর্ণ চেহারা, হাতে পায়ে শিকলের জন্য ঝুঁকে দাঁড়ানো কিন্তু উন্নত দৃষ্টি। এদের থেকে একটু দূরে বিশেষভাবে সাজানো মঞ্চে সাভারকারের ধুতি পাঞ্জাবী পরিহিত সৌম্য চেহারা! কিছুটা হলেও শান্ত মন নিয়ে হোটেলে ফিরলাম।











No comments:
Post a Comment