Wednesday, March 18, 2026

 ভালো আছি, ভালো থেকো (২)

|| দোলা সেন||
১৯/১১/২০২৪ (মঙ্গলবার)–
আজকের গন্তব্য রেড স্কিন আইল্যান্ড। ভাইয়ের পরিচিত কয়েকজন সঙ্গী হলেন। জলি বোট আর রেড স্কিন আইল্যান্ড পর্যায় ক্রমে খোলা থাকে। সম্ভবত কোরাল বাঁচাবার জন্য। জলি বয়ে কোরালের বৈচিত্র্য বেশি শুনলাম। রেড স্কিন সে তুলনায় কিছুটা নিষ্প্রভ। নৌকার মেঝে কাঁচের। তাই দিয়ে প্রবাল দেখা যায়। এই দ্বীপগুলোর সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হল, এখানে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে সময় কাটানো যায়। চায়ে গর্ম বা চাউমিন- ফুচকার দোকানের দেখা মেলে না। হালকা শুকনো খাবার এবং জল সঙ্গে রাখা ভালো। নৌাকার তলা স্বচ্ছ ফাইবারের। তা দিয়ে ফটিকস্বচ্ছ জলের তলে কোরাল দেখা যায়। প্রথম দর্শনের মুগ্ধতা বড় তীব্র হয়। জলের দিকে তাকিয়ে দেখি সেখানে নীল সবুজ ফিরোজা রঙের নানান স্তর। জলের এই বর্ণবৈচিত্র্য আন্দামানের সমুদ্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সেদিনই বিকেলে গেলাম সেুলার জেলে। ইতিহাস যেন জীবন্ত হয়ে ধরা দিল চোখের সামনে। গেট পার হতে পা কাঁপছিল। কেন্দ্রে একটি টাওয়ার। তার থেকে সাতটি উইং সাতদিকে ছড়িয়ে গেছে। সাতটির মধ্যে দুটি উইং দুটি আগেই ভেঙেছিল। দুটি উইং ভেঙে হাসপাতাল হয়েছে। এই নির্মাণের সময় বাকি দুটিও ধ্বংস হয়। এরপর একে হেরিটেজের মর্যাদা দেওয়ায়, সাত নম্বর উইংটি রক্ষা পায়। সেটিই এখন দর্শনার্থীদের জন্য খোলা। লম্বা টানা বারান্দা আর পরপর বন্দী কুঠরী। সাভারকার ছাড়া একমাত্র শচীন্দ্র নাথ সান্যালের নামে একটি কুঠরি উৎসর্গীকৃত।এক উইং থেকে অন্য উইংয়ে যেতে হলে সেন্ট্রাল টাওয়ার দিয়ে যেতে হয়। সে যোগাযোগও রাতে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হত। কয়েদী যেন কোনোভাবেই পালাতে না পারে। অবশ্য পালিয়ে যাবেই বা কোথায়? চারিদিকে অতলান্ত সমুদ্র আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু দ্বীপে আদিম হিংস্র জনজাতির বাস। উইংয়ে গা ঘেঁষেই ফাঁসির মঞ্চ। কাজ দ্রুত সারার জন্য তিনটি মঞ্চ পাশাপাশি! কয়েদীদের দিয়ে নারকেল ভাঙিয়ে শাঁস থেঁতো করে তেলের ঘানি ঘোরানো, রাস্তার জন্য পাথর ভাঙা – অমানুষিক পরিশ্রম – ঠিক করে দেওয়া মাপ অনুযায়ী কাজ না হলে বেতের ঘায়ে রক্তাক্ত করে দেওয়াটা তো জেলের প্রভুদের অতিরিক্ত বিনোদন। বলেছি বটে হিংস্র জনজাতি, কিন্তু পৈশাচিক হি়ংস্রতায় এই ইংরেজ এবং তাদের দেশীয় ভৃত্যেরা গুনে গুনে তাদের দশ গোল দিতে পারে। এই াত্যাচারের কর্মশালায় মডেলদের দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছিলাম। আঙ্কল টমস কেবিন কিংবা রুটস এর বর্ণনাও ফিকে লাগছিল। সন্ধ্যায় দেখব সেলুলার জেলের লাইট এন্ড সাউন্ড শো। সুন্দর উপস্থাপনা, কিন্তু তথ্যনিষ্ঠ লাগেনি। সকালেই দেখেছি পাথরে খোদাই বন্দীদের তালিকা। সেখানে নব্বই শতাংশই বাঙালী নাম। কিন্তু পুরো শো জুড়ে শুধুই সাভারকারের জয়জয়াকার। বাকি বিপ্লবী বন্দীদের বিশেষ উল্লেখ নেই। একটু তেতো মন নিয়েই বেরিয়ে এলাম। পাশেই একটা ছোট্ট পার্ক। সেখানে বেশ কিছু মূর্তি আছে। সেখানে উল্লাসকর দত্ত, শচীন্দ্রনাথ সান্যাল, হেমচন্দ্র প্রমুখ বেশ কয়েকজনের মূর্তি। শীর্ণ চেহারা, হাতে পায়ে শিকলের জন্য ঝুঁকে দাঁড়ানো কিন্তু উন্নত দৃষ্টি। এদের থেকে একটু দূরে বিশেষভাবে সাজানো মঞ্চে সাভারকারের ধুতি পাঞ্জাবী পরিহিত সৌম্য চেহারা! কিছুটা হলেও শান্ত মন নিয়ে হোটেলে ফিরলাম।
কাল যাব বারাটাং।











 






ভালো আছি, ভালো থেকো

|| দোলা সেন||

-          এখানে কেমন আছেন আপনারা?

-          ভালো আছি।  সবাই মিলেমিশে শান্তিতে আছি।

খুব সাধারণ বাক্যবন্ধ। প্রথমবার নয়দিনের ছুটিতে আন্দামান গিয়ে এক অটোড্রাইভারের সঙ্গে প্রথম কথোপকথন। শুরুতে কিছু মনে হয়নি জানেন? কিন্তু ঘুরতে ঘুরতে যার সঙ্গে যখনই কথা হয়েছে, এই একই  কথা শুনে শুনে, মনের মাঝে সুর গুনগুনিয়ে ওঠে – এইখানে যদি একটুকু বাসা...

কথা পড়তে পায় না, ডাব কাটতে কাটতে পথের ধারের দোকানী বা জাল গোটাতে গোটাতে জেলে সব্বাই একস্বরে বলেন – থেকে যান। একটা বাড়ি কিনে নিয়ে, থেকে যান। চোর-ডাকাত নেই, কোনো ক্রাইম নেই – প্রকৃতির শান্ত আঁচল পাতা আছে শুধু। চা বানাতে বানাতে এক দিদি বলেন – তিরিশ বছর ধরে আছি। আজকাল মেইনল্যান্ডে গিয়ে থাকতে পারি না। দশ-বারো দিন থাকব বলে যাই, পাঁচ-সাত দিনেই পালিয়ে আসি। ভীড়, মারপিট, চুরি, ছিনতাই ...।

একজন সদুঃখে  জানালেন – শিলিগুড়ির বাসস্ট্যান্ডে সুটকেশ রেখে দু-মিনিটের জন্য টয়লেট গেছি, এসে আর পেলামই না! - বিস্ময়ের সঙ্গে ক্ষোভ ঝরল গলায়।

বিস্মিত হচ্ছিলাম আমিও। সত্যি বলছে তো! দুবারে প্রায় দিন কুড়ি কাটিয়ে বিশ্বাস করতে অসুবিধে হয়নি।

আন্দামান - নীলের কোলে শ্যামল সে দ্বীপ প্রবাল দিয়ে ঘেরা। সমুদ্র তাকে বহু বছর আলাদা করে রেখেছিল। সবুজ বন, বনবাসী মানুষ আর আপন জীববৈচিত্র্য নিয়ে এক নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে জীবন চলছিল তার নিজস্ব গতিতে। পঞ্চাশ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে দিন কাটাত পৃথিবীর অন্যতম আদিম অধিবাসীরা – গ্রেট আন্দামানীজ, জারোয়া, ওঙ্গে আর সেন্টিনেলীর দল। মানব সভ্যতা যে গতিতেই এগিয়ে চলুক না কেন, তাদের আদিম বনজীবনে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। সপ্তদশ শতাব্দীতে ভূপর্যটকদের দল প্রথম এর অস্তিত্ব সম্বন্ধে জানায়। কিন্তু আদিবাসীদের তীব্র প্রতিরোধে সেখানে কেউ বসতি স্থাপনের চেষ্টাই করেনি। আন্দামানের জনজীবন  ভীষণভাবে ধাক্কা খেল পরের শতকে। ভারতের শাসনভার তখন ইংরেজদের হাতে। তারা দেখল এখানে এই দ্বীপটির অবস্থান নৌসেনার এক ঘাঁটি হবার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মূলত সেই কারণে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য একটা বিচ্ছিন্ন এবং দুঃসহ কারাগার তৈরি করতে পোর্ট ব্লেয়ারে বসতি স্থাপন হল। তৈরি হল কুখ্যাত সেলুলার জেল। মূল ভূখন্ড থেকে প্রায় তেরশ’ কিলোমিটার সমুদ্র পার করে জাহাজে করে বন্দীদের নিয়ে আসা হত। এতে  মূল ভূখন্ড থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে দেওয়াও গেল, আর নৌবহরের জন্য কাঠ, বন কেটে বসত করার জন্য বেতনহীন শ্রমিকও পাওয়া হল। সে অত্যাচারের বর্ণনা আপনারা অনেক শুনেছেন। পরে ধীরে ধীরে আরও নানান জায়গায় বসতি স্থাপন হয়। গ্রেটার আন্দামানীজ আর ওঙ্গেরা মূলস্রোতে মিশে গেছে অনেকটা 💩 ই। জারোয়ারা কিছুটা নিজেদের মতো থাকে। তবে সভ্যজগতের সঙ্গে একেবারে সম্পর্কহীন নয়। তবে সেন্টিনেলীজরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে। তাদের থাকার দ্বীপগুলি একেবারে বিচ্ছিন্ন। সেখানে যাবার অনুমতি নেই। সে চেষ্টা করতে গিয়ে বেশ কিছু মানুষের প্রাণও গেছে।

সব মিলিয়ে এই জনজীবন নিয়ে খুব আগ্রহ হয়েছিল। তদুপরি তার সৌন্দর্যের কথা এত শুনেছি, যে সুযোগ হতেই পাড়ি দিয়েছিলাম আন্দামানের উদ্দেশ্যে।  প্রথমবারের সেই আনন্দ ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিই এবার।

 

 

দুবছর আগে - ১৮/১১/২০২৪ (সোমবার)–

দু ঘন্টার উড়ানে আকাশ থেকেই চোখে পড়ল সমুদ্রে ঘেরা সবুজ দ্বীপখানি। সকাল বারোটার মধ্যে ঢুকে হোটেল সি ভিউ। হোটেল থেকে দূর সমুদ্রের দেখা মেলে। মোটামুটি ছিমছাম। সবচেয়ে সুবিধের কথা হলো বেরিয়েই অটো স্ট্যান্ড। স্বাধীনভাবে চলে যাওয়া যায় যে কোনো জায়গায়। ট্যুরিস্টের কাছে বেশি পয়সা নেবার প্রবণতা নেই। গল্প করতে করতে নিশ্চিন্তে চলে যাওয়া যায়। পথ ঝকঝকে।  কথা ছিল বিকেলে সেলুলার জেল দেখব। আর লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো। কিন্তু দেখা গেল সোমবার এখানকার সব দ্রষ্টব্য স্থান বন্ধ থাকে। অতএব চল করবাইন কোভ। অটোড্রাইভার দাঁড় করালেন এক জায়গায়। রেলিংঘেরা পথ দিয়ে একটু এগোতেই নিচে সমুদ্র। আগ্নেয় শিলার খাঁজে খাঁজে জলের খেলা। মুগ্ধ হয়ে দেখি। আরো এগিয়ে বালুকাবেলা। রঙে রঙে আকাশ রাঙিয়ে সূর্যদেব পাটে বসলেন। রঙ ছড়িয়ে গেল ভিজে বালুতেও।